আজ শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ ইং

সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

অনলাইন ডেস্কঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সশস্ত্র বাহিনীকে একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে কাজ চলছে। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আলাদা ইনস্টিটিউট, একাডেমি এবং দুটি বিশেষায়িত মেরিটাইম ও এভিয়েশন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। তিনি বলেন, ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ (এনডিসি) আমার হাতে তৈরি। সারা বিশ্ব থেকে এখানে সশস্ত্র বাহিনীর অফিসাররা প্রশিক্ষণ নিতে আসেন। সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োজিত নারী সদস্যদের প্রশংসা করে তিনি বলেন, যখন জাতিসংঘে যাই, কর্মকর্তাদের মুখে তাদের প্রশংসা শুনি তখন গর্বে বুকটা ভরে যায়। বিশ্ব দরবারে বাঙালি মাথা উঁচু করে চলবে। আমি প্রথমবার সরকারে এসে নারীদের সশস্ত্র বাহিনীতে নেওয়ার ব্যবস্থা করি। বর্তমানে সেনাবাহিনীতে ব্যাটালিয়ন কমান্ডার হিসেবে চারজন নারী সেনা কর্মকর্তা রয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন কঙ্গোতে সর্বপ্রথম নারী অফিসার ও অন্যান্য পদবির সমন্বয়ে ‘ফিমেল এনগেজমেন্ট’ প্লাটুন নিয়োগ করা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে গতকাল বিকালে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। তিনি এ সময় সশস্ত্র বাহিনীকে সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে কাজ করে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে বর্তমান সরকার কাজ করছে। শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সশস্ত্র বাহিনীকে কাজ করে যেতে হবে। সেনা সদস্যদের কাজের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগও সেনা সদস্যরা বুক চিতিয়ে মোকাবিলা করছেন। এ ছাড়া মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা সদস্যদের আশ্রয় ও নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়েও তারা প্রশংসনীয় কাজ করছেন। দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষা মিশনেও আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা প্রশংসা পেয়েছেন।

সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সিলেট, কক্সবাজারের রামু ও বরিশালে পৃথক তিনটি পদাতিক ডিভিশন গড়ে তোলা হয়েছে। বিস্তীর্ণ সমুদ্রসীমা ব্যবহারে নৌবাহিনী কাজ করছে। দেশে তাদের যুদ্ধজাহাজ বানানোর কাজ চলছে। বিমান বাহিনীর জন্য বিভিন্ন উন্নত উপকরণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তি ও আধুনিক উপকরণের মাধ্যমে প্রতিটি বাহিনীকে যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আলাদাভাবে কাজ চলছে। আমাদের মিলিটারি একাডেমি আজ বিশ্বে প্রশংসিত। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সুযোগ-সুবিধাও বৃদ্ধি করা হয়েছে। আমরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। নিজেরা নিজেদের দেশ গড়ে তুলতে চাই। কারও থেকে সাহায্য নিয়ে আর চলতে চাই না।

আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য সুন্দর ও শান্তির একটি দেশ রেখে যেতে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। বক্তব্য শেষে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে উপস্থিত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য এবং তাদের পরিবারবর্গ, কূটনীতিক ও আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান জি এম কাদেরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন বাহিনী প্রধান, সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হবেন না-প্রধানমন্ত্রী : এর আগে সকালে ঢাকা সেনানিবাসের আর্মি মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্সে স্বাধীনতা যুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের উত্তরাধিকারীদের সংবর্ধনা এবং সশস্ত্র বাহিনীর পদক ও অসামান্য সেবা পদক প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় প্রধানমন্ত্রী অপপ্রচারে কান না দিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মাঝে মাঝেই দেখি অপপ্রচার চালিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। আমি সবাইকে বলব, এই অপপ্রচারে কান দেবেন না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই পিয়াজ নাই, লবণ নাই, এটা নাই, সেটা নাই-নানান ধরনের কথা প্রচার হয়। এভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়। আমি জানি এটা করবে, এটা স্বাভাবিক। সেটাকে মোকাবিলা করেই আমাদের চলতে হবে। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বরং উদ্বৃত্ত খাদ্যের দেশ। আমাদের মাছ উৎপাদন বেড়েছে, তরিতরকারি উৎপাদন বেড়েছে। খাদ্য ও পুষ্টির দিকে আমরা বিশেষভাবে দৃষ্টি দিচ্ছি। আমরা প্রতিটি মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য যথাযথ কাজ হাতে নিয়েছি।

অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার ওপর গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযোদ্ধা যারা বেঁচে আছেন, আপনারা আপনাদের ছেলেমেয়ে, নাতি-পুতি অথবা এলাকাবাসীর কাছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলবেন। বিজয়ী জাতি হিসেবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেন জানতে পারে যে বাঙালি কখনো পরাজিত হতে পারে না। সেই মর্যাদায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা গর্বিত জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। কারও কাছে হাত পেতে নয়, আমরা আমাদের নিজেদের সম্পদ দিয়ে নিজেদের গড়ে তুলব। বিশ্বসভায় সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে চলব। বিজয়ী জাতি হিসেবে নিজেদের আত্মমর্যাদাবোধ গড়ে উঠবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম মাথা উঁচু করে চলতে শিখবে। এ সময় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, তিন বাহিনী প্রধানসহ সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা : সশস্ত্র বাহিনী দিবস-২০১৯ উপলক্ষে সকালে সশস্ত্র বাহিনীর বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঢাকা সেনানিবাসের ‘শিখা অনির্বাণে’ পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান তারা। মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর শহীদদের মহান আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানানোর অংশ হিসেবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক রাষ্ট্রপতি সকালে শিখা অনির্বাণের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর একটি চৌকস দল রাষ্ট্রপতিকে অভিবাদন জানান। রাষ্ট্রপতি সেখানে রক্ষিত পরিদর্শক বইয়ে স্বাক্ষর করেন। এর আগে রাষ্ট্রপতি শিখা অনির্বাণে পৌঁছালে তিন বাহিনী প্রধানগণ এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানান। পরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও শিখা অনির্বাণ চত্বরে আসেন এবং ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি শিখা অনির্বাণ চত্বরে সংরক্ষিত পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনীর চৌকস সদস্যের একটি দল এ সময় গার্ড অব অনার প্রদান করে। এ সময় বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা সেনানিবাসের শিখা অনির্বাণে পৌঁছালে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল আওরঙ্গজেব চৌধুরী, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের (এএফডি) প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মাহফুজুর রহমান প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। শিখা অনির্বাণে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব শেষে প্রধানমন্ত্রী সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে যান। যেখানে তিন বাহিনী প্রধানগণ তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এর আগে ভোরে দেশের সব সেনানিবাস, নৌঘাঁটি ও স্থাপনা এবং বিমান বাহিনী ঘাঁটির মসজিদগুলোতে দেশের কল্যাণ ও সমৃদ্ধি এবং সশস্ত্র বাহিনীর উত্তরোত্তর উন্নতি ও অগ্রগতি কামনা করে ফজরের নামাজ শেষে বিশেষ মোনাজাতের মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। ঢাকা ছাড়াও খুলনা, চাঁদপুর, বরিশাল ও চট্টগ্রামে বিশেষভাবে সজ্জিত নৌবাহিনী জাহাজগুলো গতকাল বেলা ২টা হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সর্বসাধারণের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত ছিল।

সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন